স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ” স্বদেশ, শিক্ষা ও সমস্যা “

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাঙ্গালি জাতি শিক্ষার গুরুত্ব ক্রমেই বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে । যেমনটা তারা আগে থেকেই বুঝিত ” ছাগল দিয়ে ধান চাষ হয় না ” আবার ” ঘোড়ার কাজ কি গাধা দিয়ে হয় ” প্রভৃতি । যাহোক এমন প্রবাদ বাক্য বাংলার গ্রামের কোষপুঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । কিন্তু এর গুরুত্ব না বুঝিয়া কেবল বাহ্য ব্যবহার হয়ে আসছে এ কাল অবধি। কিন্তু বাঙালির বর্তমান এ পরিনতির জন্য আমি এদের কখনো দোষারোপ করব না, তবে বহমান সময় এদের অভিসাপ থেকে মুক্তি দেয়নি। কারণ, ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থাই এর মূল কারন । ততকালীন সময়ে হিন্দু কলেজ থেকে যারা কেবল ইংরেজিতে ভালো পন্ডিত হইত তাদেরকেই কেবল পিয়ন বা কেরানীর চাকরি দেওয়া হইত । সেই কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ও বাংলায় রয়ে গেছে, তাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কে কেবল ‘ চাকরি পাওয়া ‘ বলেই শিখে আসছে । বাংলায় নারী শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত প্রান জন বীটন সাহেব দেখিলেন এই অনুকরণ প্রিয় জাতি শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাবার মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়েছে, নিজের সত্ত্বাকে ভৃত্যে পরিনত করছে । তখন তিনি বলেছিলেন ” যে শিক্ষা স্বদেশ কে চেনায় না, নিজ সংস্কৃতিকে চেনায় না, সে শিক্ষা আসলে কোন শিক্ষা না ” । জন বীটনের সময় থেকে দু’শ বছর পেরিয়ে গেল, এ জাতি কেবল বুঝিতে শুরু করেছে এ ভৃত্য তৈরির শিক্ষা আসলে কোন শিক্ষা না । কাজেই, কোন জাতি’র দেশ ও সংস্কৃতি কে সামনে রেখে যে শিক্ষা, তাই ঐ জাতির প্রকৃত শিক্ষা এবং তা ক্রমেই ঐ জাতিকে উন্নততর করে তুলবে । বর্তমান সময়ের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা যে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে সকলকে ভৃত্য বানিয়ে ফেলছে তার প্রকৃত উদাহরণ এই যে, যে শিক্ষার্থী ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গবেষণা ও স্বদেশের কল্যান করার কথা । দেখা যায় সেই শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার-ই পাশ করে বিসিএস দিয়ে পুলিশ, ম্যাজিস্টেট, পররাষ্ট্র বিভিন্ন ক্যাডার হচ্ছে । বড় কোন নাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মানে হচ্ছে যে বড় কোন চাকরি পাবে । অর্থাৎ শিক্ষার উদ্দেশ্য যেন কেবল চাকরি পাওয়া এ বিশ্বাস যেনো সবার মগজে গেথে গেছে । সময়ের সাথে সাথে অনেক লেখক এই শিক্ষা ব্যবস্থা কে ‘মানুষ মারার কল’, ‘বেকার তৈরির কারখানা ‘ প্রভৃতি বলে উল্লেখ করেছেন । কিন্তু সত্যিকার অর্থে এগুলো কেবল প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার দৃশ্যমান কিছু ফল। আসলে, প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের যাবতীয় সমস্যার মূল এই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, যার অনেক সরাসরি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না

বর্তমান সময়ে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক লেখা দেখা যাচ্ছে যে কতিপয় গবেষণা সংস্থার চেয়ারম্যান যোগ্যতা নিয়ে । উক্ত ব্যাক্তি সমূহের যোগ্যতা এরুপ যে, তারা গবেষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত অথচ তাদের ব্যাক্তিগত কোন গবেষণাপত্র নেই, শুধুমাত্র এদেশ সেদেশ থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন গবেষণা সংস্থার প্রধানদের যোগ্যতা এরুপ হলে রাষ্ট্র এসব সংস্থার নিকট হতে কি পাবে বা প্রত্যাশা করতে পারে?। এখানেই কেবল শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করছে যে উক্ত ব্যাক্তিসমূহের নিজস্ব গবেষণাপত্র থাকতে হবে । কিন্তু এরপর ও অারেকটি প্রশ্ন থেকে যায় যে এরুপ ব্যাক্তিবর্গ ঐ পদে আসলো কি করে?? তাকে ঐ পদে নিয়োগ দিয়েছে অবশ্যই রাষ্ট্র পরিচালকগন । এখন তাহলে রাষ্ট্র পরিচালকগণের শিক্ষাগত যোগ্যতায় অাসি । তার আগে আর একটু বলে নেই, কোন গবেষণা সংস্থায় একজন গবেষক নিয়োগ দেওয়া হলে -গবেষকের কেমন যোগ্যতা প্রয়োজন, কার সেই যোগ্যতা আছে, এবং কাকে নিয়োগ দিলে ভালো হবে, তা পর্যালোচনা করতে হলে তাকেও অবশ্যই গবেষক হতে হবে । কারন, একজন গবেষকের পর্যালোচনা কেবল একজন গবেষকই পারেন । কিন্তু আমাদের দেশের রাষ্ট্র পরিচালকগণের যোগ্যতা এরুপ যে, কেউ স্বশিক্ষিত, কেউ মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, কেউ ব্যবসাই, কেউ শিল্পী -অভিনেতা, কেউ আমলা ছিল, কেউ সেনা ছিল প্রভৃতি । কজেই, শিক্ষার যে মূল্য তা আর দেওয়া হচ্ছে না। আর প্রকৃত বা দেশজ শিক্ষার তুলনায় ঐসব গবেষক যোগ্যতাহীন হলে, তদানুযায়ী বলা যায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকগণের মাঝে এখনো শিকার আলো পৌঁছাতে পারেনি । কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালকগণের হওয়ার কথা গবেষকদের গবেষক । তাই, আগেই বলেছি এ জাতি কেবল শিক্ষার মূল্য বুঝতে শুরু করেছে কিন্তু অন্ধকার থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি ।

এবার আসি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, একটা সময় ছিলো যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানেই বুদ্ধিজীবী ভাবা হতো। কারণ, তখন তারা স্বদেশ ও নিজ সংস্কৃতিকে জানতো, এমনকি তারা স্বদেশের জন্য অকাতরে প্রান দিয়েছেন । কিন্তু বর্তমান সময়ে এরুপ দাড়িয়েছে যে- যে ছাত্র কেবল নোট শীট এ বদ্ধ থেকে সিজিপিএ-৪ পেয়ে ডিপার্টমেন্টের ফাস্ট হয়েছে, তাকেই বুদ্ধিজীবীর ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে । অথচ এদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় বুদ্ধিজীবী দিবস কবে?? দেখা যাবে উত্তর দিতে পারছে না, নতুবা ভাব নিয়ে বলবে এসব ইতিহাস টিতিহাস অার্ট্সের শিক্ষার্থীরা জানবে । এই হলো বর্তমান সময়ের ট্যাগধারী বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা । বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ শিক্ষার উদ্দেশ্য বলতে দুটো জিনিস বুঝে হয় ১. ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক হতে হবে, নতুবা ২. বিসিএস দিতে হবে, যা কেবল চাকরি কেন্দ্রিক বিশ্বাস, মনোভাব বা এর বহিঃপ্রকাশ । কিন্তু একথা স্মরণ রাখা উচিত যে স্বদেশ ও সংস্কৃতি কে সামনে না রেখে যে শিক্ষাই গ্রহন করা হোক না কেনো, তা প্রকৃতপক্ষে কোন শিক্ষা নয় এবং সে শিক্ষায় স্বদেশের কোন কল্যান আসবে না ।

One thought on “স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ” স্বদেশ, শিক্ষা ও সমস্যা “

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s